সামাজিক মাধ্যমে আসক্তি : অদৃশ্য এক ফাঁদে তরুণ প্রজন্ম

৯ জুন ২০২৬ (বিবিনিউজ ): সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আসক্তির প্রভাব কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের দৈনন্দিন জীবনে মানসিক এবং শারীরিক—উভয় ক্ষেত্রেই ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এদের অনেকেই বিষণ্নতা, উদ্বেগ, খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যা এবং ঘুমের অনিয়মের মতো নানা জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছে।

কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এতটাই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে যে, কেউ কেউ আত্মক্ষতির পথ বেছে নিচ্ছে, এমনকি আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদিও অনেক কিশোর-কিশোরী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্বাস্থ্যকর উপায়ে ব্যবহার করে, তবে একটি অংশের মধ্যে গুরুতর আসক্তি তৈরি হচ্ছে। সাধারণ কথোপকথনে ‘আসক্তি’ শব্দটি প্রায়ই ব্যবহার করা হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি একটি গুরুতর অবস্থা, যার পরিণতিও হতে পারে অত্যন্ত গুরুতর।

সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তির ভয়াবহ প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী এক লেখায় এমনটি তুলে ধরেছেন এসএমভিএলসির প্রতিষ্ঠাতা আইনজীবী ম্যাথিউ পি. বার্গম্যান। তার ভাষ্য, কিশোর-কিশোরী ও তরুণরা সামাজিক মাধ্যম আসক্তির প্রভাবের কারণে তাদের দৈনন্দিন জীবনে মানসিক ও শারীরিক উভয়ভাবেই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। অনেকেই বিষণ্নতা, উদ্বেগ, খাদ্যাভ্যাসজনিত ব্যাধি এবং ঘুমের সমস্যায় ভুগছে। কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যম আসক্তির নেতিবাচক প্রভাব এতটাই গুরুতর হয়েছে যে কেউ কেউ নিজের ক্ষতিসাধন, এমনকি আত্মহত্যার পথও বেছে নিচ্ছে।

সামাজিক মাধ্যম আসক্তির প্রভাব
মানুষ স্বভাবগতভাবেই সামাজিক প্রাণী, যারা সরাসরি সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে মানসিক ও শারীরিকভাবে উপকৃত হয়। তবে এই উপকারী প্রভাবগুলো মূলত মুখোমুখি যোগাযোগের মাধ্যমেই ঘটে।

সামাজিক মাধ্যমে হওয়া যোগাযোগ প্রায়ই কৃত্রিম। এখানে থাকা বিজ্ঞাপন ও ছবি অনেক সময় সম্পাদিত ও অবাস্তব হয়। অনেক তরুণ এগুলোকে বাস্তব মনে করে নিজেদের জীবন ও চেহারার সঙ্গে তুলনা করে এবং সেই মানে পৌঁছানোর চেষ্টা করে, যা প্রায়ই ব্যর্থ হয়। দেশজুড়ে তরুণদের পক্ষ থেকে এ ধরনের প্রভাবের জন্য মামলা করা হচ্ছে।

ঘুমের ঘাটতি
গবেষণায় দেখা যায়, আমেরিকানরা গড়ে দিনে ৩৪৪ বার তাদের ফোন চেক করে। অনেক কিশোর-কিশোরী ফোন নিয়েই ঘুমায় এবং রাতের বেলায় বারবার নোটিফিকেশন দেখে, ফলে তাদের ঘুম অখণ্ড থাকে না। ঘুমের ঘাটতির কারণে তারা বিষণ্নতা, আত্মহত্যা প্রবণতা, মানসিক চাপ, উদ্বেগ, মনোযোগের সমস্যা, অতিসক্রিয়তা ও অস্থিরতা, মাদকাসক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

যদিও যুক্তরাষ্ট্রের একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস সর্বোত্তম ঘুমের জন্য দিনে সর্বোচ্চ ২ ঘণ্টা ডিভাইস ব্যবহারের সুপারিশ করে।

বাস্তব জীবনে দায়িত্বে অবহেলা
অতিরিক্ত সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার বাস্তব জীবনের সম্পর্ক ও দায়িত্বের চেয়ে অনলাইন সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দিতে বাধ্য করে। বারবার নোটিফিকেশন চেক করার বাধ্যতামূলক প্রবণতা দৈনন্দিন কাজ ও কথোপকথনে বিঘ্ন ঘটায়।

শিক্ষা
সামাজিক মাধ্যম আসক্তি শিক্ষাগত অর্জনে উল্লেখযোগ্য পতন ঘটাতে পারে। এর কারণ হতে পারে পড়াশোনার চেয়ে সামাজিক মাধ্যমকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং ঘুমের অভাবজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

সম্পর্ক
সামাজিক মাধ্যম অনেক সময় বাস্তব সম্পর্কের জায়গা দখল করে নেয়। অনলাইন সম্পর্কের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ বাস্তব জীবনের কথোপকথনে মনোযোগ দিতে বাধা দেয়।

অনেক তরুণ শুধুমাত্র পোস্ট করার জন্যই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেয়, ফলে তারা সেই মুহূর্ত উপভোগ করতে পারে না। এর ফলে বিচ্ছিন্নতা বাড়ে, বন্ধুত্ব নষ্ট হয় এবং সামাজিক দক্ষতা কমে যায়।

হীনমন্যতার সৃষ্টি
সামাজিক মাধ্যম তরুণদের নিজেদের পরিচয় ও ভাবমূর্তি পরিবর্তনে উৎসাহিত করে, যার ফলে তারা নিজেদেরকে কম যোগ্য মনে করে। তারা অন্যদের সঙ্গে তুলনা করে নিজেকে অপ্রতুল ও আকর্ষণহীন মনে করতে শুরু করে। এর ফলে আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং তারা বাস্তব জীবন থেকে দূরে সরে ভার্চুয়াল পরিচয়ে আশ্রয় নেয়।

শরীরিক সৌন্দর্য নিয়ে উদ্বেগ
তরুণরা সামাজিক মাধ্যমে অন্যদের নিজেদের চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে করে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ৪০ শতাংশ মেয়ে এবং ১৪ শতাংশ ছেলে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের পর নিজেদের শরীর সম্পর্কে খারাপ অনুভব করে।

এর ফলে অ্যানোরেক্সিয়া, বুলিমিয়া, কঠোর ডায়েটিংসহ খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যা বাড়ছে। সামাজিক মাধ্যম অনেক সময় অতিরিক্ত পাতলা হওয়ার চাপ সৃষ্টি করে এবং এসব সমস্যাকে গ্লোরিফাই করে।

আত্মবিধ্বংসী আচরণ
ঘুমের ঘাটতি, অতিরিক্ত চাপ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণে তরুণদের মধ্যে আত্মবিধ্বংসী আচরণ বৃদ্ধি পায়।

আত্মক্ষতি
অনলাইনে বেশি সময় কাটানো তরুণদের মধ্যে আত্মক্ষতির প্রবণতা বাড়ায়। সামাজিক মাধ্যমে এমন অনেক কনটেন্ট ও কমিউনিটি রয়েছেম, যা আত্মক্ষতিকে উৎসাহিত করে। এতে সংবেদনশীল তরুণরা প্রভাবিত হতে পারে।

আত্মহত্যা
১০–২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যা দ্বিতীয় প্রধান মৃত্যুর কারণ। ১০–১৪ বছর বয়সী মেয়েদের মধ্যে এই হার তিনগুণ বেড়েছে। বিশেষ করে ১৩ বছরের নিচের আফ্রিকান-আমেরিকান শিশুদের মধ্যে হার বেশি।

আত্মহত্যার প্রবণতা সৃষ্টির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে, সাইবারবুলিং, ঘুমের অভাব, অতিরিক্ত সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার, আত্মক্ষতি ও আত্মহত্যা সম্পর্কিত কনটেন্ট দেখা, নেতিবাচক সামাজিক তুলনা,
নিজের প্রতি অসততা, সামাজিক সংযোগের অভাব এবং মুড ডিসঅর্ডার।

অতিরিক্ত সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার বিদ্যমান মানসিক রোগ বাড়িয়ে দিতে পারে বা নতুন রোগ সৃষ্টি করতে পারে।

বিষণ্নতা
বাস্তব জীবনে আত্মবিশ্বাসের অভাবে অনেক তরুণ ভার্চুয়াল জগতে আশ্রয় নেয়, যা একাকীত্ব ও বিষণ্নতা বাড়ায়।

উদ্বেগ
সবকিছু মিস হয়ে যাওয়ার ভয়, চাপ ও নোটিফিকেশন চেক করার বাধ্যবাধকতা উদ্বেগ বাড়ায়।

মাদকাসক্তি
লাইক ও প্রতিক্রিয়া ডোপামিন নির্গত করে আনন্দ দেয়, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সহনশীলতা তৈরি হয়। তখন একই অনুভূতির জন্য কেউ কেউ মাদক বা অ্যালকোহলের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

সন্তানদের সামাজিক মাধ্যম আসক্তি থেকে মুক্ত করতে অভিভাবকদের করণীয়
সন্তানদের সামাজিক মাধ্যম আসক্তি থেকে মুক্ত করতে অভিভাবকদের সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সন্তানদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের কৌশল শেখানো, স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ, উদ্দেশ্যপূর্ণ ব্যবহার শেখানো, নোটিফিকেশন বন্ধ রাখার মতো জরুরি বিষয়গুলো দেখভাল করতে হবে। প্রয়োজনে থেরাপি বা চিকিৎসা নেওয়ার মতো পদক্ষেপ নিতে হবে।

Related posts

Leave a Comment